মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

মীরগঞ্জ কুঠি বাড়ি ,বুড়াইচ, আলফাডাঙ্গা

মীরগঞ্জ নীলকুঠিঃ

অষ্টাদশ শতকে মধূমতি, বারাশিয়া, চন্দনা প্রভৃতি নদীর তীরবর্তী উর্বর জমিতে নীল চাষ করা হত। আলফাডাঙ্গার মীরগঞ্জে তখন প্রধান কুঠি স্থাপন করা হয়েছিল। এই কুঠির অধীনে ৫২টি কুঠি ছিল। কুঠি ঘিরে গড়ে উঠেছিল বিশাল বাজার। প্রধান ম্যানেজার ছিলেন ডানলপ। নীল কর ডানলপ চাষীদের বাধ্য করে নীল চাষ করতে থাকেন। নীল চাষে নিরুৎসাহীদের নীল কুঠিতে ধরে এনে অমানবিক অত্যাচার করা হতো। জানা যায় এক বিঘা জমিতে নীল উৎপাদন ৮ থেকে ১২ বান্ডিল। ১০ বান্ডিলের মূল্য ছিল ১ টাকা। এই টাকা থেকেও কৃষকদের সামান্য কিছু দেওয়া হতো। পক্ষান্তরে নীলকরেরা নীল রপ্তানী করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করত। প্রতিটি কুঠি নিয়ন্ত্রনের জন্য একজন ম্যানেজার থাকত। তাকে বলা হতো বড় সাহেব। বড় সাহেবের সহকারীকে বলা হতো ছোট সাহেব। দেশীয় কর্মচারীদের প্রধানকে বলা হতো নায়েব বা দেওয়ান। নায়েবের মাসিক বেতন ছিল ৫০ টাকা। নায়েবের অধীনে ছিল একজন করে গোমস্তা। গোমস্তারা বড় ও ছোট সাহেবের কথা মতো চলত। তারা কৃষকদের ধরে এনে বেত্রাঘাত করত। এ ছাড়াও সহজ সরল কৃষকের মা বোনদের কুঠিতে ধরে এনে নিযার্তন করত। এ জন্য ইউরোপিয়ানরা নীলকে কৃষকের নীল রক্ত বলে চিহ্নিত করেছে। হাজী শরীয়তউল্লাহ ও তার পুত্র দুদু মিয়া অত্যাচারী নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কৃষকদের নিয়ে গড়ে তোলেন বিশাল এক লাঠিয়াল বাহিনী। এ বিদ্রোহ এক সময় গণ আন্দোলনে রূপ নেয় যা নী বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ১৮৩৮ সালে দুদু মিয়ার নেতৃত্বে বৃটিশ নীলকরদের সাথে কৃষকদের প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ডানলপ সাহেব আউলিয়াপুর নামক স্থানে পরাজিত হন এবং দলবল নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান।

            এই ডানলপ সাহেবের মৃত্যুর পর তাকে আলফাডাঙ্গার মীরগঞ্জে প্রধান কুঠির পাশে সমাহিত করা হয়। পূর্বে এখানে নীল প্রস্ত্ততের জন্য চুল্লী, লম্বা চিমনি, সিন্দুক, ছোট বড় অনেক ইত্যাদি ছিল। এখন তা ধ্বংস হয়ে মাটিতে পতিত হয়েছে। ঊনবিংশ শতকে নীলের চাষ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় এবং মীরগঞ্জ আস্তে আস্তে জরাজীণ হতে থাকে। শেষ চিহ্ন হিসেবে পড়ে থাকে ডানলপ সাহেবে সমাধি। সম্ভাবত ২০০০ সালের দিকে কয়েকজন লোভী ব্যক্তি সমাধিতে অনেক ধন সম্পত্তি থাকতে পারে এই লোভে এক রাত্রে যন্ত্রপাতি এবং দলবল নিয়ে সমাধি ভেংগে ফেলে। দুঃখের বিষয় তারা এ থেকে কোন মূল্যবান সম্পদ পায়নি তবে কয়েকটি পাথরের বাটি পেয়েছিল বলে লোকমুখে শুনা যায়। বর্তমানে সমাধিটি কয়েক খন্ড ভাংগা অবস্থায় ঐ স্থানেই । সমাধির গায়ে পাথরে খোদাই করা বাংলা ভাষায় কিছু লেখা আজও জ্বলজ্বল করছে। সেই লেখাটুকু গুবহু নিম্নে দেয়া হলো -

অকপুট পরোপকার বিখ্যাত নীল শ্রীযক্ত য়্যানেল কেম্পবল হানলপ ............আয়ের নামক জিলার অন্তঃপতি ডন্ডন্যান্ড নগরে বাস করিয়া সন ১১৯৫ সালে বঙ্গদেশে শুভাগমন করত মিরগঞ্জ প্রভৃতি নীল কুঠিতে ৬০ ষাট বতসর পর্যন্ত অভিশয় যশঃপূর্বক স্বজীবিত কাল যাবত অতিবাহিত করিয়া সন ১২৫৫ সালে কাত্তিক ও শুক্রবারে স্বর্গ হইয়াছেন বান্ধবগণ ও বেতনভোগী ব্যক্তিগণ চিরকাল তদ্বীয় গুনগান স্মরনাথ অর্থব্যয় দ্বারা ....... স্ফোলিত পুস্তক ...... স্থাপিত করিলেন।

 

            মীরগঞ্জ নীরকুঠি আমাদের আলফাডাঙ্গা তথা গোটা বঙ্গ দেশের অত্যাচারী নীলকরদের শোষনের এক ছোট দৃষ্টান্ত তাই আমাদের উচিত মীরগঞ্জ এর শেষ স্মৃতিটুকু রক্ষা করা তা হলে পরবর্তী প্রজন্ম জানবে বাঙলী কত শোষন নিপীড়ন সহ্য করে আজ স্বাধীনতা পেয়েছে।